রবিবার , জানুয়ারী ১৭ ২০২১
সদ্য সংবাদ

চট্টগ্রামের দৃষ্টিনন্দন মসজিদ

চট্টগ্রামের দৃষ্টিনন্দন মসজিদ

নান্দনিক, শৈল্পিক দৃষ্টিনন্দন সব মসজিদ। মসজিদগুলো ইসলামী ঐতিহ্যের স্মারক। ইতিহাসের সাক্ষী। প্রতিটি স্থাপনার আছে দৃষ্টিনন্দন রূপ। কালের নীরব সাক্ষী হয়ে দ্যুতি ছড়াচ্ছে অনুপম-শাশ্বত ধর্ম ইসলামের। প্রতিটি মসজিদই আধুনিক স্থাপত্যের ইসলামী প্রতীক হয়ে আছে। এসব মসজিদ প্রতিষ্ঠার পেছনে আছে কালজয়ী ইতিহাস, যুদ্ধজয়ের কাহিনি। চট্টগ্রামের এমন কয়েকটি মসজিদ নিয়ে এবারের রকমারির আয়োজন
অবয়বজুড়ে ইসলামিক অনন্য স্থাপত্য। মসজিদের ভিতরে আছে অসংখ্য খিলান। প্রতিটি খিলান দেখতে যারপরনাই দৃষ্টিনন্দন। ভিতরের অংশ দেখলে জুড়ে যায় দুই চোখ। নির্মাণ স্থাপত্যে স্পষ্ট মুনশিয়ানা। আছে নান্দনিকতার ছাপ। চট্টগ্রাম নগরের প্রাণকেন্দ্র ওয়াসা মোড়ে অবস্থিত জমিয়তুল ফালাহ জামে মসজিদের চিত্র এটি। বলা হয়, এটি দেশের অন্যতম বৃহত্তম ঐতিহাসিক মসজিদ। এটি কেবল দৃষ্টিনন্দন মসজিদই নয়, ইসলামী কমপ্লেক্সও। এখানে আছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত বিশাল লাইব্রেরি। পাঁচতলা মসজিদ প্লাজা ও কমপ্লেক্স মিলে ৩০ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন।
১৯৭৬ সালের ১ জুলাই ওয়াসা মোড়ে প্রায় সাড়ে ১২ একর জায়গায় এক টাকা প্রতীকী মূল্যে সেনা ভূসম্পত্তি কর্তৃপক্ষ জমিয়তুল ফালাহ মসজিদের অনুকূলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেয়। সর্বশেষ ২০০৪ সালের ১৯ এপ্রিল জমিয়তুল ফালাহ কমপ্লেক্সের সম্প্রসারিত প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়। তবে ২০১৩ সালে জাতীয় সংসদে ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন বিল-২০১৩’ পাসের মাধ্যমে এ মসজিদ ও কমপ্লেক্স ব্যবস্থাপনা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আওতায় আনা হয়।
মসজিদটির মূল ভবনের সামনে আছে বিশাল মাঠ। এখানে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয় ঈদুল ফিতর এবং ঈদুুল আজহার প্রধান জামাত। প্রতি ঈদ জামাতে এখানে অন্তত ৫০ হাজার মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন। চট্টগ্রামের সব রাজনীতিক, মন্ত্রী-এমপি এবং প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় সব কর্মকর্তা এ মসজিদে ঈদ জামাত আদায় করেন। ঈদ জামাত পরিণত হয় সামাজিক ও রাজনৈতিক মিলনমেলায়। মসজিদ ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জানাজা।
আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ মুঘল স্থাপত্যরীতিতে সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৩০ ফুট উপরে, পাহাড় চূড়ায়। মূল মসজিদের নকশা অনুযায়ী এটি ১৮ গজ দৈর্ঘ্য, সাড়ে সাত গজ প্রস্থ। মসজিদের প্রতিটি দেয়াল প্রায় আড়াই গজ পুরু। পশ্চিমের দেয়াল পোড়ামাটির, বাকি তিনটি দেয়াল পাথরের তৈরি। মাঝে একটি বড় গম্বুজ এবং দুটি ছোট গম্বুজ দ্বারা ছাদ ঢাকা। বলা হয়, মসজিদটি নির্মাণ কৌশলগত দিক থেকে ভারতের দিল্লির ঐতিহাসিক শাহী জামে মসজিদের প্রায় প্রতিচ্ছবি। দিল্লি জামে মসজিদের আদলে বড় বড় পাথর ব্যবহার করে নির্মিত বলে এ মসজিদকে পাথরের মসজিদ ‘জামে সঙ্গিন’ও বলা হয়।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ তাঁর ‘ইসলামাবাদ’ বইয়ে ‘আন্দরকিল্লা টিলার ওপর অবস্থিত জামে সঙ্গিন মসজিদ হলো বন্দর শহর চট্টগ্রামের আদি মসজিদ’ বলে উল্লেখ করেন। এটি চট্টগ্রাম অঞ্চলের মুসলিম স্থাপত্য অঙ্গনে নতুনত্ব দিয়েছে। যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুঘল সাম্রাজ্যের এক গর্বের ইতিহাস।
বর্তমানে এ মসজিদে প্রতিদিন ২ হাজার এবং প্রতি শুক্রবার প্রায় ৮ হাজার মুসল্লি নামাজ পড়েন। রমজানে এ সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। জুমাতুল বিদায় ২০ হাজার মানুষ হয়। জানা যায়, চট্টগ্রাম বিজয়কে স্মরণীয় করে রাখতে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে ১৬৬৭ সালে সুবে বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খাঁর পুত্র বুজুর্গ উমিদ খাঁ আন্দরকিল্লার উচ্চ একটি স্থানে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। কালের বিবর্তনে এটি আজ ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শন।
ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, ১৭৬১ সালে পবিত্র এ মসজিদ ইংরেজদের দখলে চলে যায়। তারা প্রায় ৯৪ বছর পর্যন্ত নিজেদের দখলে রাখে। ফলে এখানে ইবাদত-বন্দেগি করা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন মুসলমানরা। ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামের মুসলমানরা তৎকালীন জমিদার হামিদুল্লাহ খাঁর নেতৃত্বে জামে মসজিদ ফিরে পাওয়ার জন্য তৎকালীন বঙ্গদেশের গভর্নরের কাছে আবেদন করেন। তাতে ফল না হওয়ায় ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে আবারও আবেদন করেন। এবার তা মঞ্জুর করা হয়। হামিদুল্লাহ খাঁ ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে প্রয়োজনীয় মেরামত ও একটি শিলালিপি স্থাপন করে ১৩৩ বছর পর এ স্থাপত্যকে পুনরায় মসজিদে পরিণত করেন।
চট্টগ্রাম নগরের অন্যতম ঐতিহ্যময় মসজিদ নবাব ওয়ালি বেগ খাঁ জামে মসজিদ। নগরের চকবাজার মোড়ে ১৮০০ শতকে এটি নির্মিত হয়। মসজিদটি স্থানীয়ভাবে অলী খাঁ মসজিদ নামে সমধিক পরিচিত। চট্টগ্রাম মুঘল ফৌজদার ওয়ালী বেগ খাঁ ১৭১৩ থেকে ১৭১৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এটি নির্মাণ করেন। তিনি মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণে বেশ কিছু জমি দান করেন। মুঘল স্থাপত্যের আদলে তৈরিকৃত মসজিদে গম্বুজ আছে ছয়টি। এর মধ্যে চারটি বড় ও দুটি ছোট।
অপরূপ সৌন্দর্যময় এ মুসলিম স্থাপনার প্রকৃত সৌন্দর্য বাইরে থেকে তেমনটা বোঝা যায় না। তবে ভিতরের অংশটা অনেক চমকপ্রদ। মূল মসজিদের দেয়ালগুলো অনেক পুরনো। দেয়ালের পুরত্ব প্রায় এক থেকে তিন ফুট পর্যন্ত। দেয়ালের গায়ে আছে ছোট ছোট খোপ। খোপগুলোতে রাখা হয়েছে পবিত্র কোরআন শরিফ ও অজিফা। মসজিদের জন্য নির্ধারিত আছে প্রায় ১৮ শতক জায়গা। তবে মূল মসজিদটি নির্মিত হয়েছে প্রায় ছয় থেকে সাত শতক জায়গায়। বর্তমানে মসজিদটির মূল ঐতিহ্য র্ঠিক রেখে সামনে বড় আকারে বাড়ানো হয়েছে।
মসজিদটির আদি গঠন-তিনটি গম্বুজ ও আটটি মিনার। কেন্দ্রীয় মেহরাবটি অর্ধগোলাকৃতির। ছোট দুই দরজার সামনে আছে মেহরাবসদৃশ ছোট অর্ধচন্দ্রাকারের মেহরাব। ছোট মেহরাব দুটি বৃদ্ধি করেছে মসজিদটির সৌন্দর্য। তিনটি দরজার চৌকাঠের ওপরে ইটের খিলানে আবৃত। সব নান্দনিকতা ছাপিয়ে মসজিদ প্রাঙ্গণে বুখারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় তোরণের আদলে নির্মিত হয়েছে দৃষ্টিনন্দন একটি তোরণ। এ যেন ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি। চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানার শুলকবহর এলাকার আবদুল্লাহ খান সড়কে ঐতিহাসিক শেখ বাহার উল্লাহ শাহী জামে মসজিদের নান্দনিক চিত্র এটি। ধারণা করা হয়, মুঘল সুবেদার শায়েস্তা খাঁর পৌত্র শেখ বাহার উল্লাহ ১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দে মুঘল স্থাপত্যে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর এ মসজিদ শেখ বাহার উল্লাহ শাহী জামে মসজিদ নামে পরিচিতি লাভ করে। মসজিদে প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে এ ধারণা করা হয়। মসজিদটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর অধিভুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ মহামূল্যবান ও অতিসংবেদনশীল স্থাপনা। ভারতের দিল্লির কেন্দ্রীয় মহাফেজখানা ও ব্রিটেনের লন্ডনস্থ ব্রিটিশ মিউজিয়ামে শেখ বাহার উল্লাহ জামে মসজিদ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ দস্তাবেজ প্রায় ১৭০ বছর ধরে সযতেœ রক্ষিত আছে। সময়ের ব্যবধানে মসজিদটির সৌন্দর্যবর্ধন করা হলেও অক্ষত রাখা হয় মূল অবকাঠামো। ১০২ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৭৮ ফুট প্রস্থের মসজিদটির মুসল্লি ধারণ ক্ষমতা প্রায় ছয় হাজার জনের। শূন্য দশমিক ২১ একর ভূমির এ মসজিদে গম্বুজ আছে তিনটি, এর মধ্যে ছোট একটি বড় দুটি। গম্বুজের বাহ্যিক উচ্চতা ১৮ ফুট ও অভ্যন্তরীণ উচ্চতা ১০ ফুট। মিনার আছে আটটি, চারটি ছোট ও চারটি বড়। মিনারের উচ্চতা ৩০ ফুট।
চট্টগ্রামের রাউজানের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের হাড়ি মিয়া চৌধুরী এলাকায় আছে পাঁচ শ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী সাহেব বিবি মসজিদ। চুন সুরকির গাঁথুনিতে নির্মিত হয় দৃষ্টিনন্দন একটি স্থাপত্য। এর পাশে ও সামনে প্রায় চার ফুট উঁচু করে নির্মাণ করা হয়েছে গেট। স্থাপনাটি আটটি পিলার, তিনটি দরজা, দুটি জানালা ও এক গম্বুজবিশিষ্ট। কারুকাজের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে শৈল্পিক রূপ। স্থাপত্যের পাশে খনন করা হয়েছে বিশাল দিঘি। পাঁচ শ বছর আগে নির্মিত স্থাপনাটি রূপগত পরিবর্তন করে বর্তমানে লাগানো হয়েছে টাইলস।
বাদশা মুহাম্মদ শাহ স্টেটের আমলে ডিমের আঠা, চুন-সুরকি দিয়ে দেশের ২২টি গ্রামে অভিন্ন নকশায় ২২টি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। ২২টি মসজিদের মধ্যে প্রথম নির্মিত হয়েছিল সাহেব বিবির মসজিদ। জানা যায়, জমিদার আমির মোহাম্মদ চৌধুরীর পত্নী ও চট্টগ্রামের আলোচিত প্রসিদ্ধ মালকা বানুর মাতা সাহেব বিবি এ মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা। মসজিদের পাশের ফুলবাগান সংবলিত কবরস্থানে শায়িত আছেন এটির প্রতিষ্ঠাতা মরহুম সাহেব বিবি। এর পাশে আছে সাহেব বিবি দিঘি, যেটি শাহী পুকুর নামেও পরিচিত। মসজিদ ও কবরস্থান ৩০ শতক জায়গায় নির্মিত। কালের সাক্ষী এ মসজিদ দেখতে আসেন পর্যটকরা। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার শোলকাটা রাউজান গ্রামের জমিদার আমির মোহাম্মদ চৌধুরীর স্বনামধন্য পত্নী মালকা বানুর মাতা সাহেব বিবি। ধারণা করা হয়, পাঁচ শ বছর আগে তিনি মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদের আছে কারুকাজসংবলিত টেরাকোটার ইট ও চুন-সুরকির গাঁথুনি। মসজিদটির সামনে একটি ঈদগাহ ও পাশে আছে কবরস্থান।
মসজিদের পূর্ব দেয়ালে তিনটি প্রবেশপথ। পশ্চিম দিকে গম্বুজ থেকেও উঁচু মিম্বর। জনশ্রুতি আছে, অতীতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কয়েক দিনের খাবার নিয়ে পায়ে হেঁটে দূর-দূরান্ত থেকে এ মসজিদে অনেকেই নামাজ পড়ার জন্য আসতেন।

সম্পর্কিত ডেস্ক রিপোট

এছাড়াও চেক করুন

বৌভাতের খাবারে মাংস কম দেওয়ায় হাতাহাতি, প্রাণ গেল বরের চাচার

বরিশালের বাবুগঞ্জে বৌভাত অনুষ্ঠানে খাবারে মাংস কম দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের হাতাহাতিতে প্রাণ গেছে …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।