যে মানুষটি একটি ব্যাংককে নতুনভাবে গড়ে তুলেছিলেন: কীভাবে পিযুষ গুপ্ত বদলে দিলেন ডিবিএস ব্যাংককে
২০০৯ সালে যখন পিয়ূষ গুপ্ত ডিবিএস ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন প্রতিষ্ঠানটি ছিল স্থিতিশীল কিন্তু খুব একটা আলোচিত নয়। মূলত সিঙ্গাপুরের একটি দেশীয় ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ডিবিএসকে অনেকেই আমলাতান্ত্রিক ও রক্ষণশীল প্রতিষ্ঠান বলে মনে করতেন। বিশ্বজুড়ে ব্যাংকিং খাত তখনও Global Financial Crisis এর ধাক্কা সামলে উঠছিল, এবং এশিয়ার বাইরে খুব কম মানুষই উইঝ কে একটি উদ্ভাবনী বৈশ্বিক ব্যাংক হিসেবে দেখতেন।
পরবর্তী দেড় দশকে গুপ্ত আধুনিক ব্যাংকিং ইতিহাসের অন্যতম বড় রূপান্তর ঘটান— ডিবিএস কে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে প্রযুক্তিনির্ভর, লাভজনক এবং সম্মানিত ব্যাংকগুলোর একটিতে পরিণত করেন।
পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল
সিটি গ্রুপে দীর্ঘ ক্যারিয়ার শেষে গুপ্ত ডিবিএস এ যোগ দেন। বৈশ্বিক ব্যাংকিং খাতে তাঁর ব্যাপক অভিজ্ঞতা ছিল। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি দ্রুত বুঝতে পারেন, ডিবিএস এর একটি মৌলিক সমস্যা রয়েছে—ব্যাংকটির কোনো স্বতন্ত্র বৈশ্বিক পরিচয় নেই।
আর্থিক সংকট পুরো ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাগুলো সামনে এনে দিয়েছিল। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা, দক্ষতা বাড়ানো এবং স্পষ্ট কৌশল নির্ধারণ—এসব ছিল সময়ের দাবি। শুধু অধিগ্রহণ বা ভৌগোলিক বিস্তারের মাধ্যমে বড় হওয়া যথেষ্ট হবে না।
গুপ্তর বিশ্বাস ছিল, ডিজিটাল যুগে টিকে থাকতে হলে ডিবিএসকে নতুনভাবে ভাবতে হবে—একটি ঐতিহ্যবাহী ব্যাংক নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে। তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন একটি ব্যাংক তৈরি করা, যেখানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সহজ ও দ্রুত ব্যাংকিং সেবা পাওয়া যাবে।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে আগাম বিনিয়োগ
গুপ্তর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত ছিল ব্যাংকের কেন্দ্রবিন্দুতে ডিজিটাল রূপান্তরকে নিয়ে আসা।
ফিনটেক প্রতিষ্ঠানগুলোর উত্থান যখনও মূলধারার আলোচনায় আসেনি, তখনই তিনি ডিবিএসকে একটি প্রযুক্তি কোম্পানির মতো কাজ করার দিকে ধাবিত করেন।
ব্যাংকটি ব্যাপক বিনিয়োগ করে—
* ক্লাউড কম্পিউটিং
* কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
* ডেটা অ্যানালিটিক্স
* মোবাইল ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্মে
ডিবিএস চালু করে ডিজিটাল সেবা যেমন PayLah, এবং ব্যাংকের বিভিন্ন কার্যক্রমে শত শত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল যুক্ত করা হয়। এর ফলে দ্রুততর ও আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সেবা দেওয়া সম্ভব হয়—তাৎক্ষণিক রেমিট্যান্স থেকে শুরু করে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় পূর্বাভাসভিত্তিক বিশ্লেষণ পর্যন্ত।
গুপ্ত জোর দিয়ে বলেন, ডিজিটাল রূপান্তর শুধু মোবাইল অ্যাপ তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। গ্রাহক ইন্টারফেস থেকে শুরু করে ব্যাকএন্ড অবকাঠামো—পুরো প্রযুক্তিগত কাঠামোকেই নতুনভাবে সাজাতে হবে। লক্ষ্য ছিল ব্যাংকের প্রতিটি প্রক্রিয়াকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল করা, পুরোনো ব্যবস্থার ওপর কেবল নতুন ডিজিটাল ফিচার বসিয়ে দেওয়া নয়।
ফলাফল ছিল এমন একটি ব্যাংক, যা ধীরে ধীরে একটি আধুনিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের মতো দেখতে শুরু করে।
সংস্কৃতির পরিবর্তন: ২২ হাজার মানুষের একটি স্টার্টআপ
প্রযুক্তিতে বিনিয়োগই যথেষ্ট ছিল না। গুপ্ত বুঝতে পেরেছিলেন, ডিবিএস এর সাংগঠনিক সংস্কৃতিকেও একইভাবে বদলাতে হবে।
তিনি কর্মীদের নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করতে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে উৎসাহিত করেন—যা অনেকটা সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাজের ধাঁচের মতো।
হ্যাকাথন, ইনোভেশন ল্যাব এবং ডিজিটাল প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নিয়মিত আয়োজন করা শুরু হয়। হাজার হাজার কর্মী কোডিং, ডেটা বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল পণ্যের নকশা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন।
গুপ্ত প্রায়ই বলতেন, তাঁর লক্ষ্য ছিল “২২ হাজার মানুষের একটি স্টার্টআপ” তৈরি করা।
এই পরিবর্তনের ফলে কর্মীরা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের বিরোধিতা না করে বরং সেই পরিবর্তনের সক্রিয় অংশীদার হয়ে ওঠেন।
স্থানীয় ব্যাংক থেকে আঞ্চলিক শক্তি ডিজিটাল রূপান্তর ছিল গুপ্তর কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু, কিন্তু একই সঙ্গে তিনি উইঝ এর আঞ্চলিক উপস্থিতিও শক্তিশালী করেন।
ব্যাংকটি তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত করে—
* হংকং
* চীন
* ভারত
* ইন্দোনেশিয়া
* তাইওয়ান
এসব বাজারে অধিগ্রহণ ও অংশীদারিত্বের মাধ্যমে উইঝ একটি শক্তিশালী এশীয় ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে।
একই সঙ্গে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বড় শাখা নেটওয়ার্ক ছাড়াই নতুন গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়। বিশেষ করে ভারতে ডিবিএস একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংক চালু করে, যেখানে গ্রাহকরা শাখায় না গিয়েই ব্যাংকিং সেবা নিতে পারেন।
ফলাফল: এক নাটকীয় সাফল্য
এই রূপান্তরের ফল ছিল চমকপ্রদ।
গুপ্তর নেতৃত্বে—
ডিবিএস এর মুনাফা দ্রুত বৃদ্ধি পায়, যা ২০২৩ সালে ১০ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার ছাড়িয়ে যায়
ব্যাংকটির বাজারমূল্য দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পায়, এবং এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে মূল্যবান ব্যাংকে পরিণত হয়
ডিজিটাল চ্যানেল হয়ে ওঠে গ্রাহকদের প্রধান ব্যাংকিং মাধ্যম
ডিবিএস বিশ্বজুড়ে বহু পুরস্কার অর্জন করে, যার মধ্যে রয়েছে একাধিকবার শ্রেষ্ঠ ব্যাংকের স্বীকৃতি । বিশ্বের বিভিন্ন ব্যবসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিবিএসএর রূপান্তর এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কেস স্টাডি।
নেতৃত্বের ধরন: নির্দেশদাতা থেকে অনুপ্রেরণাদাতা
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গুপ্তর নেতৃত্বের ধরনও বদলে যায়।ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি নিজেকে নির্দেশনামূলক ও বিশ্লেষণধর্মী নেতা হিসেবে দেখতেন। কিন্তু ডিবিএস এর রূপান্তরের সময় তিনি কর্মীদের আরও স্বাধীনতা দেন, নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করতে উৎসাহিত করেন এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করেন।
এর ফলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয় যেখানে প্রতিষ্ঠানের যেকোনো স্তর থেকেই নতুন ধারণা উঠে আসতে পারে।
একটি দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার
১৫ বছরেরও বেশি সময় নেতৃত্ব দেওয়ার পর যখন পিয়ূষ গুপ্ত দায়িত্ব ছাড়েন, তখন তিনি ডিবিএসকে আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী, উদ্ভাবনী এবং বিশ্বজুড়ে সম্মানিত একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে যান।
এক সময়ের রক্ষণশীল একটি এশীয় ব্যাংক এখন ডিজিটাল রূপান্তরের বৈশ্বিক উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গুপ্তর নেতৃত্ব প্রমাণ করেছে—প্রযুক্তি, সংস্কৃতি এবং নেতৃত্ব যদি একসঙ্গে কাজ করে, তবে বড় এবং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানও নিজেদের নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে।
শেষ পর্যন্ত, পিয়ূষ গুপ্ত শুধু ডিবিএসকে পরিচালনা করেননি—তিনি ডিজিটাল যুগে একটি ব্যাংক কী হতে পারে, সেটিই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।